আশুরা কি
আশুরা কি: ইতিহাস, ফজিলত, আমল ২০২৬
আশুরা কি?
ইসলামি হিজরি বছরের প্রথম মাস মহররম। আর এই মাসের ১০ তারিখকে "ইয়াওমুল আশুরা" (আশুরা) বলা হয়। ইসলামের ইতিহাসে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতময় একটি দিন। এই দিনে আল্লাহ তাআলা বহু মহান ঘটনা সংঘটিত করেছেন এবং মুসলিমদের জন্য বিশেষ ইবাদতের সুযোগ রেখেছেন।
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলিম এই দিনটিকে রোজা, দোয়া, তওবা এবং আল্লাহর স্মরণে কাটানোর চেষ্টা করেন। আশুরা কেবল একটি ঐতিহাসিক দিন নয়, বরং ঈমান, ধৈর্য, আত্মত্যাগ এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসার এক অনন্য শিক্ষা।
আশুরার ইতিহাস
আশুরার ইতিহাস অনেক পুরনো। বিভিন্ন নবীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও এই দিনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে ইসলামী বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। তবে সহিহ হাদিসের আলোকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো—
হযরত মুসা (আ.)-এর বিজয়
ফিরআউন ছিল পৃথিবীর অন্যতম অত্যাচারী শাসক। সে নিজেকে উপাস্য দাবি করত এবং বনি ইসরাইলদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাত।
আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা (আ.)-কে নির্দেশ দেন তাঁর অনুসারীদের নিয়ে বের হয়ে যেতে। ফিরআউন বিশাল বাহিনী নিয়ে তাদের ধাওয়া করলে আল্লাহ সমুদ্রকে দ্বিখণ্ডিত করে দেন। মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা নিরাপদে পার হয়ে যান, আর ফিরআউন ও তার সৈন্যবাহিনী সমুদ্রে ডুবে যায়।
এই মহান বিজয়ের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ হযরত মুসা (আ.) আশুরার দিন রোজা রাখতেন।
রাসুল (ﷺ) কেন আশুরার রোজা রাখতেন?
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যখন মদিনায় হিজরত করেন, তখন তিনি দেখেন ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখছে।
তাদের জিজ্ঞেস করলে তারা জানায়—
"এদিন আল্লাহ মুসা (আ.)-কে ফিরআউনের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন।"
তখন রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,
"মুসার প্রতি আমাদের অধিকার তোমাদের চেয়ে বেশি।"
এরপর তিনি নিজেও রোজা রাখেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন।
পরবর্তীতে তিনি বলেন, যদি পরবর্তী বছর জীবিত থাকেন তবে ৯ ও ১০ মহররম—দুই দিন রোজা রাখবেন, যাতে মুসলিমদের আমল অন্যদের থেকে আলাদা হয়।
আশুরার রোজার ফজিলত
আশুরার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো রোজা রাখা।
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
"আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।"
এখানে ছোটখাটো গুনাহ বোঝানো হয়েছে। বড় গুনাহ থেকে মুক্তি পেতে অবশ্যই আন্তরিক তওবা করতে হবে।
আশুরার দিনে কয়টি রোজা রাখা উত্তম?
আলেমদের মতে সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি হলো—
৯ ও ১০ মহররম
অথবা ১০ ও ১১ মহররম
অথবা ৯, ১০ ও ১১—তিন দিন
শুধু ১০ মহররমেও রোজা রাখা বৈধ, তবে ৯ বা ১১ তারিখ যুক্ত করা অধিক উত্তম।
কারবালার ঘটনা ও আশুরা
আশুরার সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা হলো কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা।
এই দিনে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত হুসাইন (রা.) অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শহীদ হন।
এই ঘটনা মুসলিম উম্মাহকে শিখিয়ে দেয়—
সত্যের পথে অটল থাকা
জুলুমের কাছে মাথা নত না করা
আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া
তবে মনে রাখতে হবে, ইসলামে শোক প্রকাশের নামে নিজের শরীরকে আঘাত করা, বুক চাপড়ানো বা রক্ত ঝরানো বৈধ নয়।
আশুরার দিনে করণীয়
আশুরার দিনটি ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করা উচিত।
বিশেষভাবে—
রোজা রাখা
বেশি বেশি দোয়া করা
কুরআন তিলাওয়াত করা
ইস্তিগফার করা
নফল নামাজ আদায় করা
দান-সদকা করা
আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা
নিজের জীবনের ভুলের জন্য তওবা করা
আশুরার দিনে বর্জনীয় কাজ
কিছু কাজ ইসলামে ভিত্তিহীন বা বিদআত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
যেমন—
নিজের শরীরকে আঘাত করা
বুক চাপড়ানো
রক্ত ঝরানো
কুসংস্কারে বিশ্বাস করা
আশুরাকে কেন্দ্র করে নতুন ধর্মীয় রীতি উদ্ভাবন করা
অপ্রমাণিত ফজিলতের গল্প প্রচার করা
মুসলিমদের উচিত কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে আমল করা।
আশুরা আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
১. আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা
সমুদ্র সামনে, ফিরআউনের বাহিনী পেছনে—তবুও মুসা (আ.) আল্লাহর ওপর ভরসা হারাননি।
আমাদের জীবনেও কঠিন পরিস্থিতি আসবে। কিন্তু একজন মুমিন জানেন, আল্লাহ চাইলে অসম্ভবও সম্ভব।
২. সত্যের জন্য ত্যাগ
হুসাইন (রা.) আমাদের শিখিয়েছেন—
সত্যের পথে চলতে হলে কখনো কখনো বড় ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।
৩. ধৈর্যের গুরুত্ব
আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।
আশুরা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কষ্ট চিরস্থায়ী নয়।
৪. তওবার সুযোগ
নতুন হিজরি বছরের শুরুতেই আশুরা আসে।
এটি যেন আমাদের জন্য নতুনভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার একটি সুযোগ।
আশুরা সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
ভুল ধারণা ১
শুধু ১০ মহররম পালন করলেই যথেষ্ট।
সঠিক কথা: ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ রাখা উত্তম।
ভুল ধারণা ২
আশুরায় বিশেষ খাবার রান্না করা ফরজ।
সঠিক কথা: এর কোনো সহিহ দলিল নেই।
ভুল ধারণা ৩
এই দিনে বিশেষ দোয়া না পড়লে কোনো ফজিলত পাওয়া যায় না।
সঠিক কথা: কুরআন-সুন্নাহতে নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ দোয়া বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
আধুনিক জীবনে আশুরার গুরুত্ব
আজকের ব্যস্ত জীবনে মানুষ মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং নানা সমস্যায় জর্জরিত।
আশুরা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
আল্লাহ কখনো তাঁর বান্দাকে একা ছেড়ে দেন না।
ধৈর্যের ফল সবসময় সুন্দর।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা উচিত নয়।
ক্ষমা চাইতে কখনো দেরি করা উচিত নয়।
পরিবারকে কীভাবে আশুরার শিক্ষা দেবেন?
যদি আপনার সন্তান থাকে, তাহলে তাদের—
মুসা (আ.)-এর গল্প বলুন।
ফিরআউনের পরিণতি বোঝান।
হুসাইন (রা.)-এর সাহসের কথা শেখান।
একসঙ্গে রোজা রাখার উৎসাহ দিন।
দোয়া ও কুরআন পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
এভাবেই নতুন প্রজন্ম ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা জানতে পারবে।
উপসংহার
আশুরা শুধুমাত্র ক্যালেন্ডারের একটি দিন নয়। এটি ঈমানকে নবায়ন করার, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের, অতীতের ভুলের জন্য তওবা করার এবং সত্যের পথে দৃঢ় থাকার একটি বিশেষ সুযোগ।
আমরা যেন এই দিনটিকে কেবল ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণে সীমাবদ্ধ না রেখে, নিজের জীবন পরিবর্তনের উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করি। রোজা রাখি, বেশি বেশি ইবাদত করি, কুরআন তিলাওয়াত করি এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আশুরার প্রকৃত শিক্ষা উপলব্ধি করার এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমীন।
FAQ (Frequently Asked Questions)
পোস্ট ট্যাগঃ
